ব্রেকিং নিউজ
নিউজডিবিএন ডেস্ক
২৫ জুলাই ২০২৬, ৯:০১ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

যানজটের ঢাকা: গণপরিবহনই হতে পারে মুক্তির একমাত্র পথ

যানজটের ঢাকা: গণপরিবহনই হতে পারে মুক্তির একমাত্র পথ

এটি অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশের জন্যও বড় হুমকি। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা ও পরিকল্পিত নগরায়ণ। — ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক রাজধানী, অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে রাজধানীতে আসেন।

কিন্তু সম্ভাবনার এই শহর আজ ভুগছে এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটে—যানজট। এটি এখন আর শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতি, নাগরিক জীবন, পরিবেশ ও উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার মোট ভূমির মাত্র ৭ থেকে ৭.৫ শতাংশ সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অথচ উন্নত বিশ্বের অনেক শহরে সড়কের জন্য বরাদ্দ থাকে ২৫ শতাংশ বা তারও বেশি ভূমি।

সীমিত সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মোটরযান ও অমোটরযান চলাচল করায় যানজট কার্যত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে রাস্তার সক্ষমতার তুলনায় কয়েক লাখ বেশি যানবাহন চলাচল করছে। প্রতিদিন নতুন করে শত শত যানবাহন রাস্তায় যুক্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় ঢাকার সড়কে অনেক বেশি যান চলাচল করায় যানজট আরও তীব্র হচ্ছে।

একই সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামাও সংকটকে জটিল করে তুলেছে। যানজটের কারণে প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এতে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ছে, জ্বালানির অপচয় হচ্ছে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবাও বিলম্বিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, সময়ও একটি মূল্যবান সম্পদ। সেই সম্পদের অপচয় দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, গণপরিবহনের দুর্বলতা মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে। মানসম্মত বাসের অভাব, অনিয়মিত রুট ব্যবস্থাপনা এবং নিম্নমানের যাত্রীসেবা এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের অনেক শহর একসময় ঢাকার মতোই তীব্র যানজটে ভুগলেও পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। সিঙ্গাপুর ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আধুনিক এমআরটি ও বাসব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

জাপানের টোকিওতে রেলভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থাই নগর যাতায়াতের মূল ভরসা। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, মেট্রোরেল ও বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়। ভারতের দিল্লি মেট্রোও গণপরিবহননির্ভর নগর ব্যবস্থার একটি সফল উদাহরণ। বাংলাদেশেও ইতোমধ্যে মেট্রোরেল চালু হয়েছে, নতুন লাইন নির্মাণাধীন রয়েছে। বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (BRT), এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিভিন্ন ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়; বরং সমন্বিত নগর পরিবহন নীতির আওতায় এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলেই কেবল দীর্ঘমেয়াদে সুফল মিলবে। যানজট নিরসনে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে— – পরিকল্পিত সব মেট্রোরেল লাইন দ্রুত সম্পন্ন করা।

– কার্যকর BRT ও বাস রুট র‍্যাশনালাইজেশন বাস্তবায়ন। – আধুনিক, নিরাপদ ও সময়নিষ্ঠ গণপরিবহন বৃদ্ধি। – বাস, মেট্রো ও রেলের জন্য সমন্বিত টিকিট ব্যবস্থা চালু। – স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল ও ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো। – অবৈধ পার্কিং ও ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। – স্কুল ও অফিসের সময় ধাপে ধাপে নির্ধারণ করে পিক আওয়ারের চাপ কমানো। – শহরতলির সঙ্গে কমিউটার রেল সংযোগ সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বিকেন্দ্রীকরণ। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, মেট্রোরেল, আধুনিক বাস বা রেলব্যবস্থায় বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ এর মাধ্যমে কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হয়, উৎপাদনশীলতা বাড়ে, জ্বালানির ব্যবহার কমে, পরিবেশ দূষণ হ্রাস পায় এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়। ঢাকাকে যদি সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য, প্রতিযোগিতামূলক ও আধুনিক মহানগরে পরিণত করতে হয়, তবে ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর চিন্তা থেকে বেরিয়ে গণপরিবহনকেন্দ্রিক নগর উন্নয়নের পথে এগোতেই হবে।

কারণ একটি উন্নত শহরের পরিচয় কেবল উঁচু ভবন নয়; বরং এমন একটি পরিবহন ব্যবস্থা, যেখানে সাধারণ মানুষ দ্রুত, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। আজ যে শিশু স্কুলবাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে, যে শ্রমিক প্রতিদিন কর্মস্থলে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেন, যে রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না—তাদের প্রত্যেকের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত দেশেরই ক্ষতি। তাই যানজটকে শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে নয়, জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার এখনই সময়।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩৫ জেলায় নিত্যপণ্যের বাজারে অভিযানে ৬ লাখ টাকা জরিমানা

১

মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল পরীক্ষা ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু

২

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জেবিআইসির গভর্নরের বৈঠক, ঢাকায় কার্যালয় খোলার প্রস্তাব

৩

সত্যি কী মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ!

৪

জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চালিকাশক্তি: প্রধানমন্ত্রী

৫

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সাক্ষাৎ

৬

আকামার মেয়াদ শেষ হলেও সৌদি আরবে প্রবেশের সুযোগ পাবেন প্রবাসীরা- প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী

৭

কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের সমুদ্রসৈকতে পরিনত করতে হবে: পর্যটন মন্ত্রী

৮

সাজেকে পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ইউপিডিএফের গুলিবর্ষণ: সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তিন হাজার পর্যটক উদ্ধার

৯

দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক

১০

সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়তে চাই: প্রধানমন্ত্রী

১১

স্বৈরাচারের ফেরার পথ খুলে দেয়া হবে জুলাই ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি : প্রধানমন্ত্রী

১২

ছাত্রদল নেতা রুমির সহায়তায় সুস্থ হলেন জবি শিক্ষার্থী নীল

১৩

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সৌদিতে নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ আনা হবে: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী

১৪

পরিকল্পনা ও সদিচ্ছায় পরিচ্ছন্ন-পরিবেশবান্ধব এলাকা গড়ে তোলা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

১৫

তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে নবনিযুক্ত প্রধান তথ্য কমিশনার ও দুই কমিশনারের সাক্ষাৎ

১৬

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজেরই সম্পদ, তাদের জীবন মানউন্নয়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে -সমাজকল্যাণ মন্ত্রী

১৭

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস পালিত

১৮

ডাক বিভাগকে আধুনিক ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরে কাজ করছে সরকার: ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী

১৯

জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে: এলজিআরডি মন্ত্রী

২০